গণজাগরণ মঞ্চের উক্তি নিয়ে আ. লীগে ক্ষোভ


'সরকারের স্পর্ধা' নিয়ে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে সম্প্রতি যে মন্তব্য করা হয় তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সর্বশেষ শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্রের একটি উক্তি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও সমালোচনা করেন। বিরোধী দল ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠেছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিএনপির দম বন্ধ হয়ে আসে। জন্যই দলটি সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার আহবান জানায়। তিনি বলেন, 'অনেক কষ্ট করে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। এখন জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কোন পরিবেশে থাকতে চান।'
গতকাল রবিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের মুলতবি সভায় এসব কথা বলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত পৌনে ১০টা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক অবস্থা, করণীয়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। 
গত ২৬ মার্চ শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ডা. এমরান এইচ সরকার তাঁর বক্তৃতায় বলেন, 'দুঃখের বিষয়, আমাদের দাবির ব্যাপারে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। মনে হচ্ছে সরকারের টনক নড়েনি, সরকার ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে, যা প্রকারান্তরে গণমানুষের দাবিকে উপেক্ষা করার শামিল। দাবি উপেক্ষা করে সরকার যে স্পর্ধা দেখিয়েছে, তা নজিরবিহীন।' 
সূত্রে জানা যায়, ইমরানের বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে দলের প্রচার সম্পাদক . হাছান মাহমুদ, সদস্য আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম, যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বক্তব্য দেন। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, 'সরকারের স্পর্ধা নিয়ে প্রশ্ন তোলার স্পর্ধা গণজাগরণ মঞ্চ পায় কোথায়? তাদের বক্তৃতার ড্রাফট কে লেখে, তার খোঁজ লাগান?' সময় সভাপতিমণ্ডলীল সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বলেন, 'অনেকেই মনে করে গণজাগরণ মঞ্চের বক্তৃতা আমি ড্রাফট করে দেই, বিষয়টি সত্য নয়। আমিও মনে করি তাদের আন্দোলন এখন বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত।' মতিয়া চৌধুরী বলেন, 'তাদের আন্দোলন থেমে গিয়েছিল, কিন্তু ব্লগার রাজিব নিহত হওয়ার পরে তারা আবার আন্দোলন জোরদার করে।' এর জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, 'ইমোশন দিয়ে আন্দোলন রাজনীতি হয় না। এর জন্য বাস্তবতা অনুসরণ করতে হয়।'
সূত্র আরো জানায়, হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যের সমালোচনা করে নাছিম বলেন, এসব মন্তব্যে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, 'অল রাবিস' 
সূত্র মতে, সভায় নারায়ণগঞ্জে আইভী-শামীমের বিরোধের প্রসঙ্গ তুলে কেন্দ্রীয় নেতারা এর সমাধান জরুরি দাবি করলে শেখ হাসিনা দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনকে বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এই বিরোধের মধ্য দিয়ে সেখানে আরো লাশ ফেলবে জামায়াত-শিবির। এর দায়-দায়িত্ব আওয়ামী লীগের ওপর বর্তাবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা উঠলে শেখ হাসিনা বলেন, 'খুব শিগগির আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবে। 
বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতার এই সময়ে নেতা-কর্মীদের মাঠে থাকার নির্দেশনা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, 'আমাদের নেতা-কর্মীরা মাঠে সতর্ক থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সাহস পাবে।' সভায় সৈয়দ আশরাফ বিএনপি-জামায়াত জোটের নৈরাজ্য ঠেকাতে সারা দেশে গণসংযোগ কর্মসূচির প্রস্তাব দেন। শেখ হাসিনা প্রস্তাবের প্রতি গুরুত্বারোপ করে শিগগির এর তারিখ নির্ধারণ করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
সূত্র আরো জানায়, সারা দেশের জেলা সম্মেলন শেষ করতে আরো দুই মাস সময় বৃদ্ধি করেন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তিনি মেয়াদ পার হওয়া কমিটিগুলোর আরো ছয় মাস সময় বাড়িয়ে দেন।
খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে সরকারপ্রধান বলেন, 'লালমনিরহাটের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের কী অপরাধ? প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা কেন? মেডিক্যালের শিক্ষার্থীর কী অপরাধ? বোমায় তাঁর চোখ নষ্ট হলো কেন? ছোট বাচ্চার ওপর বোমা মারছেন, পুলিশকে পিটিয়ে বোমা মেরে হত্যা করছেন।' প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, 'চট্টগ্রামে আহত শিক্ষার্থীকে আমি ঢাকায় নিয়ে এসেছি। আজ (গতকাল) শিবিরের হামলায় আহত পুলিশ সদস্যকেও ঢাকায় নিয়ে এসেছি উন্নত চিকিসার জন্য। এই পুলিশ সদস্য হাত দিয়ে বোমাটি না ধরলে অনেক মানুষ হতাহত হতো। কারণে পুলিশ সদস্যের দুই হাত মারাত্মকভাবে জখম হয়।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এসএসসি পরীক্ষার সময় হরতাল দিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত করা হচ্ছে। উনি চান না জাতি শিক্ষিত হোক। সচেতন হোক। উনি চান সবাই তাঁর মতো স্বশিক্ষিত থাকুক।'
শেখ হাসিনা বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে বিরোধী দল অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। ধ্বংস করতে যত রকমের কর্মকাণ্ড করা দরকার তারা তা করে যাচ্ছে। শুধু সরকারের বিরুদ্ধে নয়; বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিল করতে এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন যেতে না পারে সে জন্যও তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে।
বিরোধীদলীয় নেতার সমালোচনা করে সরকারপ্রধান বলেন, 'উনি যেখানে ট্যুরে (সফর) যাবেন তার আগে সেখানে মন্দির ভাঙেন। পরে সমবেদনা জানান। আগে কাটেন পরে মলম লাগান। তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলের মতো জয় বাংলা বলে অনেক সময় মন্দিরে হামলা চালানো হয় আমাদের ঘাড়ে দোষ দেওয়ার জন্য। উনার কথায় তা ধরা পড়ে গেছে।'
শেখ হাসিনা বলেন, 'মহানবীকে নিয়ে কোনো কটূক্তি বরদাশত করা হবে না। সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। এর জন্য কোনো আন্দোলন করতে হবে না। আমরাও তো মুসলমান। ইসলাম নিয়ে কেউ কটাক্ষ করলে আমাদের অনুভূতিতেও আঘাত লাগে। আমার ধর্মের মর্যাদা কিভাবে রক্ষা করতে হবে তা ভালো করেই জানা আছে। জন্য আমরা ইউটিউব বন্ধ করে দিয়েছি। এর জন্য তো কাউকে আন্দোলন করতে হয়নি।'
ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পর্যাপ্ত ত্রাণ দেওয়া হয়নি- বিরোধী নেত্রীর বক্তব্যের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, 'দুর্যোগ মোকাবিলায় কী করতে হবে তা কারো কাছ থেকে আমাদের শিখতে হবে না। বিএনপি নেতা ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর বলেছিলেন, যত মানুষ মরার কথা ছিল তত মরেনি। আর আমরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছি। তাদের কেউ এখন খোলা আকাশের নিচে নেই। আমাদের হাতও আছে, মনও আছে।' বিরোধীদলীয় নেতাকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'উনি দেন না কেন? কয়েক দিন আগে নাকি সিঙ্গাপুর থেকে অনেক টাকা নিয়ে এসেছেন।'


প্রধানমন্ত্রীর স্বাগত বক্তব্যের পর মাগরিবের নামাজের বিরতি দেওয়া হয়। তারপর আবার শুরু হয় বৈঠক। দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ অন্যান্য সদস্য সময় উপস্থিত ছিলেন। রাত ৮টায় রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বৈঠক চলছিল
সুত্র- কালের কন্ঠ